April 24, 2026, 2:32 am

সংবাদ শিরোনাম
রংপুর পীরগাছার দেউতিহাট ইজারা নিয়ে নয়-ছয় ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে শীর্ষ অবস্থানে আলমগীর হোসেন ধনীদের সংখ্যা বাড়ছে: ৫ বছরে বিলিয়নিয়ার হতে পারে প্রায় ৪ হাজার রংপুর কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের শপিং কমপ্লেক্স, সংকুচিত সদস্যপদ আর বিস্তৃত ক্ষমতার এক অনুসন্ধান গাজীপুরে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি বন বিভাগের গেজেট থেকে অবমুক্তি প্রয়োজন রামুতে গাঁজাসহ দম্পতি আটক কাজের প্রলোভন দেখিয়ে অপহরণ, ৭ দিন পর ৩ যুবক উদ্ধার হিলিতে আধিবাসী উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিদ্যালয়ে এসএসসি’র দোয়া ও বিদায় অনুষ্ঠান মরিচের লাল রং মুছে গেলে যা থাকে এক্সিম ব্যাংকের প্রতারণার শিকার জামাল কন্সট্রাকশন কোম্পানির প্রোপাইটর

রেস্টুরেন্ট, ভবন, আর অদৃশ্য টাকা: এক কর্মকর্তার সম্পদের নীরব বিস্তার


জেলা প্রতিনিধি, রংপুর
১২ এপ্রিল ২০২৬
চিঠিটি পাঠানো হয়েছে ইমেইলে,নীরবে। কোনো মিছিল ছিল না, ছিল না ক্যামেরার ঝলক। শুধু একটি আবেদন–তথ্য অধিকার আইনের ফরম ‘ক’এর মাধ্যমে। গন্তব্য: জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। তারিখ: ১২ এপ্রিল ২০২৬। উদ্দেশ্য, একজন কর্মকর্তার সম্পদের পথ খুঁজে বের করা। এই গল্পের শুরু সেখানেই নয়। শুরু আরও আগে–একটি সংবাদ সম্মেলনে।

mostbet

রংপুরে ‘সুজন’-এর সেই সম্মেলনে প্রথম উচ্চারিত হয় অভিযোগটি–জ্ঞাত আয়ের বাইরে সম্পদ অর্জন। নামটি উচ্চারিত হলে ঘরের ভেতর এক ধরনের অস্বস্তি নেমে আসে। কারণ, তিনি কেবল একজন সরকারি কর্মকর্তা নন; তিনি এমন একটি জায়গায় অবস্থান করেন, যেখানে অর্থের প্রবাহ দেখা যায় না, কিন্তু অনুভূত হয়।
তারপর শুরু হয় প্রতিবেদন। একটি নয়, একাধিক। জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকাগুলোতে ধারাবাহিক অনুসন্ধান। তথ্যগুলো প্রথমে বিচ্ছিন্ন ছিল–একটি রেস্টুরেন্ট, একটি ভবন, কয়েকটি ব্যবসা। পরে সেগুলো একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করে।

রংপুর সমবায় মার্কেটের ষষ্ঠ তলায় একটি রেস্টুরেন্ট। বাজারমূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা। এর সঙ্গে যোগ হয় আরও দেড় কোটি টাকার ডেকোরেশন। মোট ব্যয় –সাড়ে চার কোটি। কাগজে মালিকানা স্ত্রীর নামে। অর্থ পরিশোধের কাগজে দেখা যায় শ্বশুরের নাম।
কিন্তু এখানেই প্রথম অসামঞ্জস্য। একাধিক সূত্র বলছে, শ্বশুরের আর্থিক সক্ষমতা সেই পরিমাণ অর্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এই অমিলটি কেবল একটি সংখ্যা নয় –এখানেই গল্পের ভেতরের আরেক গল্প শুরু হয়।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বললেন–”এখানে টাকা আসে না, টাকা ঘোরে।’ মালিকানা এক জায়গায়, নিয়ন্ত্রণ আরেক জায়গায়।’

রেস্টুরেন্টটি একা নয়। সেনপাড়ায় একটি বহুতল আবাসিক ভবন। আরএএমসি মার্কেটে ‘ক্যাফে ডি’ নামে আরেকটি রেস্টুরেন্ট–শ্যালকের নামে। ধাপ ও জেল রোড এলাকায় ব্যবসা ও জমির তথ্য। প্রথমে এগুলো আলাদা আলাদা বিনিয়োগ মনে হয়। কিন্তু নথি ও সূত্র মিলিয়ে দেখলে একটি নেটওয়ার্কের ছবি ফুটে ওঠে–পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং ঘনিষ্ঠদের নামে ছড়িয়ে থাকা সম্পদ। একজন সাবেক রাজস্ব কর্মকর্তা বলেছেন–”এগুলো সরাসরি নিজের নামে রাখার ঝুঁকি এখন কম লোকই নেয়। কারণ,স্তর থাকলে মূল মালিককে আড়াল করতে সুবিধা হয়।”

পাশ্চাত্যের সাংবাদিকরা একে বলে ‘পেপার ট্রেইল’ –কাগজের পথ। এই ক্ষেত্রে সেই পথ আংশিক দৃশ্যমান।
রেস্টুরেন্টের বরাদ্দ নথি, ডেকোরেশন খরচের আনুমানিক হিসাব, ব্যবসার লাইসেন্স, কিন্তু যে অংশটি অনুপস্থিত, সেটিই মূল প্রশ্ন–টাকার উৎস। একজন ব্যাংকিং বিশ্লেষক বলেছেন–”যদি বৈধ আয়ের সঙ্গে বিনিয়োগের অনুপাত না মেলে, তাহলে ধরে নিতে হয়–অন্য কোথাও থেকে অর্থ এসেছে। প্রশ্ন হলো, সেই ‘অন্য কোথাও’ কোথায়?”

এই অভিযোগ নতুন নয়। সংবাদ সম্মেলনের পর থেকে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপের তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। এই নীরবতাই দ্বিতীয় স্তরের প্রশ্ন তৈরি করে। কোনো বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে কি?
সম্পদ বিবরণী যাচাই করা হয়েছে কি? অনুমতি ছাড়া বিনিয়োগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়েছে কি?
একজন সাবেক আমলা বললেন–”প্রশাসনে অনেক সময় তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই সেটিকে থামিয়ে দেওয়া হয়,অদৃশ্যভাবে।”

এই গল্পে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। স্ত্রী, শ্বশুর, শ্যালক–সবাই আলাদা সত্তা, কিন্তু আর্থিক প্রবাহে তারা একটি চক্রের অংশ বলে মনে হয়। একজন বিশ্লেষকের ভাষায়–”এটা কোনো একক দুর্নীতির গল্প নয়। এটি একটি সমন্বিত স্বার্থজাল–যেখানে প্রত্যেকে একটি ভূমিকা পালন করে।” কে কাকে রক্ষা করছে–এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর মেলে না। কিন্তু নীরবতা, বিলম্ব, এবং কাগজের অসামঞ্জস্য–সব মিলিয়ে এমন এক ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে প্রশ্ন ওঠার আগেই উত্তর চাপা পড়ে।

সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য সম্পদ বিবরণী দাখিল করা বাধ্যতামূলক। বড় ধরনের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনুমতি নেওয়ার বিধানও রয়েছে। যদি এসব নিয়ম মানা হয়ে থাকে–তাহলে নথি আছে। যদি না মানা হয়ে থাকে–তাহলে সেটিও একটি তথ্য। তথ্য অধিকার আইনের আবেদনটি তাই শুধু একটি চিঠি নয়। এটি একটি পরীক্ষা–প্রতিষ্ঠান কতটা স্বচ্ছ?

চিঠিটি এখন একটি দপ্তরের কোনো টেবিলে। হয়তো ফাইলের নিচে পড়ে আছে, না হলে প্রক্রিয়াধীন।
কিন্তু এই গল্প থেমে নেই। কারণ, এখানে কেবল একজন কর্মকর্তার সম্পদের প্রশ্ন নয়; এখানে রাষ্ট্রের একটি মৌলিক প্রশ্ন জড়িয়ে আছে–ক্ষমতা কি নিজেকে জবাবদিহির বাইরে রাখতে পারে? আর যদি পারে–তাহলে সত্য কি এখানে টিকে থাকার আগেই হারিয়ে যায়?

Share Button

     এ জাতীয় আরো খবর